গলস্টোন (Gallstone) হচ্ছে পিত্তথলিতে (Gallbladder) গঠিত কঠিন কণা বা পাথর। পিত্তথলি লিভারের নিচে অবস্থিত একটি ছোট থলি যা পিত্ত (bile) সংরক্ষণ করে। পিত্ত একটি হজমকারী রস যা চর্বি হজমে সাহায্য করে।
গলস্টোনের ধরন
গলস্টোন মূলত দুই ধরনের হতে পারে:
- কোলেস্টেরল গলস্টোন (Cholesterol Gallstones): এটি সবচেয়ে সাধারণ প্রকার। এই গলস্টোন প্রধানত কোলেস্টেরল দিয়ে গঠিত হয়।
- পিগমেন্ট গলস্টোন (Pigment Gallstones): এই গলস্টোন কালো বা বাদামি রঙের হয় এবং প্রধানত বিলিরুবিন দিয়ে গঠিত হয়।
গলস্টোনের কারণ
গলস্টোন তৈরির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- পিত্তে অত্যধিক কোলেস্টেরল
- পিত্তে বিলিরুবিনের অতিরিক্ত উপস্থিতি
- পিত্তথলির অপর্যাপ্ত খালি হওয়া
গলস্টোনের ঝুঁকির ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা
- ওজন হ্রাসের জন্য দ্রুত ডায়েট
- গর্ভাবস্থা
- পরিবারে গলস্টোনের ইতিহাস
- উচ্চ কোলেস্টেরলযুক্ত খাদ্যগ্রহণ
গলস্টোনের লক্ষণ
অনেক সময় গলস্টোন কোনো লক্ষণ সৃষ্টি করে না। কিন্তু যখন গলস্টোন কোনো সমস্যার সৃষ্টি করে, তখন সাধারণত নিম্নলিখিত লক্ষণ দেখা যায়:
- তীব্র পেটব্যথা, বিশেষত ডান দিকের উপরের পেটে
- পিঠের দিকে ব্যথা ছড়ানো
- ডান কাঁধে ব্যথা
- বমি বমি ভাব বা বমি
এগুলোকে প্রায়ই গলস্টোন আক্রমণ (Gallstone Attack) বলা হয়।
গলস্টোনের জটিলতা
গলস্টোনের কারণে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন:
- পিত্তথলির প্রদাহ (Cholecystitis): পিত্তথলিতে গলস্টোন আটকে গেলে প্রদাহ হতে পারে।
- পিত্তনালীর বাধা (Bile Duct Obstruction): গলস্টোন পিত্তনালীতে আটকে গেলে পিত্ত নিঃসরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
- অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ (Pancreatitis): গলস্টোন অগ্ন্যাশয়ের নালীতে আটকে গেলে অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহ হতে পারে।
গলস্টোনের নির্ণয়
গলস্টোন নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন, যেমন:
- আলট্রাসাউন্ড (Ultrasound): গলস্টোন নির্ণয়ের জন্য সবচেয়ে সাধারণ এবং নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
- সিটি স্ক্যান (CT Scan): গলস্টোন শনাক্ত করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
- হাইডা স্ক্যান (HIDA Scan): পিত্তথলির কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য ব্যবহৃত হয়।
গলস্টোনের চিকিৎসা
গলস্টোনের চিকিৎসা নির্ভর করে লক্ষণ ও জটিলতার উপর। লক্ষণহীন গলস্টোন সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু লক্ষণযুক্ত বা জটিলতাপূর্ণ গলস্টোনের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত চিকিৎসা প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হয়:
- ওষুধ: গলস্টোন দ্রবীভূত করতে কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ দেওয়া হয়। তবে এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদি এবং সব রোগীর ক্ষেত্রে কার্যকর নয়।
- পিত্তথলি অপসারণ (Cholecystectomy): এই পদ্ধতিতে সার্জারির মাধ্যমে পিত্তথলি অপসারণ করা হয়। এটি গলস্টোনের জন্য সবচেয়ে সাধারণ ও কার্যকরী চিকিৎসা।
- এন্ডোসকপিক রেট্রোগ্রেড কোলাঞ্জিওপ্যানক্রিয়াটোগ্রাফি (ERCP): পিত্তনালীতে আটকে থাকা গলস্টোন অপসারণের জন্য ব্যবহৃত হয়।
গলস্টোন প্রতিরোধ
গলস্টোন প্রতিরোধে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে:
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার ও কম চর্বিযুক্ত খাদ্যগ্রহণ করতে হবে।
- ওজন নিয়ন্ত্রণ: স্থূলতা গলস্টোনের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই সঠিক ওজন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
- পর্যাপ্ত পানি পান: পানি পানের মাধ্যমে পিত্তের সঠিক প্রবাহ বজায় রাখা যায়।
- নিয়মিত ব্যায়াম: নিয়মিত ব্যায়াম পিত্তথলির কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
উপসংহার
গলস্টোন একটি সাধারণ সমস্যা যা অনেক সময় লক্ষণ সৃষ্টি করে না। তবে, কিছু ক্ষেত্রে এটি তীব্র ব্যথা ও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সঠিক নির্ণয় ও চিকিৎসার মাধ্যমে গলস্টোনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গ্রহণের মাধ্যমে গলস্টোন প্রতিরোধ করা যায়।
1 Comment
Thank you